1. iamparves@gmail.com : admin :
  2. backupadmin@wordpress.com : backupadmin :
  3. firstbdnews@wp-ads.net : Firstbdnews Customer : Firstbdnews Customer
  4. najmulhasan7741@gmail.com : najmul hasan : najmul hasan
  5. janathatv19@gmail.com : Shohag Khan : Shohag Khan
  6. support@wordpness.org : WordPress Technical : WordPress Technical
  7. backup@wordpress.com : wp-backup :
শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৪:২৪ পূর্বাহ্ন

মানব পাচারের রানি নূরজাহান

Reporter Name
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

ছিলেন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর। সেই সুবাদে রপ্ত করেন আদম ব্যবসার কলাকৌশল, সখ্য গড়েন ঊর্ধ্বতন কর্তাদের সঙ্গে। প্রথমে স্বামী আব্দুস সাত্তারের নামে খোলেন এসএএম ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১২০৩)। এরপর নিজের নামে টি-২০ ওভারসিজ (আরএল: ১৪১৫)। এরপর কর্মচারীর নামে, ভাইয়ের নামেসহ বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন এমনকি বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সিকে টাকার বিনিময়ে অনুমোদন পাইয়ে দেওয়াসহ নানাবিধ অপরাধকর্মে জড়ানোর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলেও জামিনে বেরিয়ে হন আরও বেপরোয়া। বিএমইটির (জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) বহির্গমন বিভাগে প্রবেশ নিষেধ থাকলেও সেখানে রয়েছে তার অবাধ যাতায়াত। সরকারি অফিস সময় শেষে তিনি সেখানে বসান অনিয়মের অফিস। সম্প্রতি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক পাঠানোর অনুমোদন নিয়েছেন। তবে যে কোম্পানির ডিমান্ড লেটারে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, অনুসন্ধানে সেই কোম্পানির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ভুয়া নথিপত্রে কম্বোডিয়া হয়ে ইউরোপে মানব পাচারের নেটওয়ার্কও তার নিয়ন্ত্রণে। এমন বহুমুখী অনিয়মে জড়িয়ে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ। অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুদকে চলমান একাধিক মামলা। এরপরও ভয়ানক বেপরোয়া তিনি। ধরাকে সরা জ্ঞান করে এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন নানাবিধ অপরাধকর্ম। প্রচণ্ড প্রভাবশালী এই নারীর নাম নূরজাহান আক্তার।

 

এই নারীর সঙ্গে মেক্সিকান কুখ্যাত ড্রাগ কার্টেল নেটওয়ার্কের প্রভাবশালী মাফিয়া নারী সান্দ্রা আভিলা বেলত্রানের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ‘কুইন অব প্যাসিফিক’ হিসেবে পরিচিতি পান। সান্দ্রা আভিলা বেলত্রান সে সময় কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সমুদ্রপথের আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেট, অর্থ পাচার ও সংঘটিত অপরাধের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক ছিলেন। তবে ২০০৭ সালে গ্রেপ্তার হলে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। ২০১৫ সালে জামিনে বের হয়ে পুরো বদলে যান সান্দ্রা। তার তুলনায় আরও ‘এক কাঠি সরেস’ বাংলাদেশের আদম পাচারকারী নূরজাহান আক্তার। তিনি গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে হয়ে ওঠেন আরও বেপরোয়া—যেন ‘কুইন অব ট্রাফিকিং’।

 

জানা গেছে, নুরজাহান আক্তার ও তার স্বামী আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক মামলা ও অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। একটি মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। দুদকে কমিশন গঠন হলে সে প্রতিবেদনটি অনুমোদন হতে পারে। তদন্তে দুদক কর্মকর্তা নূরজাহান আক্তারের বিরুদ্ধে সাড়ে ৩ কোটি টাকারও বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পেয়েছেন। প্রতিবেদনে এ কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। এ ছাড়া লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি হত্যার ঘটনায় পল্টন থানার একটি মামলার চার্জশিটে অন্যতম অভিযুক্ত নূরজাহান ও তার স্বামী আব্দুস সাত্তার।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) এক বিশাল ভূমিকা রয়েছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রবাসী শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। আর এ প্রতিষ্ঠানে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরের চাকরি করতেন নূরজাহান আক্তার। তবে সে চাকরি তিনি বেশিদিন করেননি।

 

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হলে চাকরি হারান। পরে জেল থেকে বের হয়ে শুরু করেন পুরোদমে আদম ব্যবসা। একের পর এক রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদন নিয়ে গড়ে তোলেন নিজস্ব সিন্ডিকেট। যার মধ্যে নূরজাহানের নামে রয়েছে টি-২০ ওভারসিজ, যার আর এল নম্বর: ১৪১৫, স্বামী আব্দুস সাত্তারের নামে রয়েছে মেসার্স এসএএম ইন্টারন্যাশনাল, যার আরএল নম্বর: ১২০৩, ভাইয়ের নামে সুফিয়ানা ট্রেড লিংক, যার আরএল নম্বর: ১৬০১। এ ছাড়া মেসার্স নাহিন ইন্টারন্যাশনাল নামে আরও একটি রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে তার অফিসের কর্মচারীর নামে। যেখানে মালিকের নাম মো. হাসান মিয়া। তবে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) ওয়েবসাইটে দেওয়া ফোন নম্বরটি চেক করে দেখা গেছে, সেটি নূরজাহান আক্তার ব্যবহার করেন। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি লাইসেন্সের কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্রোকারি করেন নূরজাহান আক্তার। বর্তমানে মেসার্স নাহিন ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকে তিন হাজার কর্মী পাঠানোর জোর প্রচেষ্টা চলছে।

 

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান শাখা থেকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি একটি চিঠি অনুমোদন করা হয়। সেই চিঠির বিষয়বস্তুতে বলা হয়েছে, রিক্রুটিং এজেন্সি মেসার্স নাহিন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (আরএল-২৫৫০) ইরাকগামী তিন হাজার কর্মী OEP-তে অন্তর্ভুক্তির অনুমতি প্রদান প্রসঙ্গে। এরপর চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘উপরোক্ত বিষয় ও সূত্রোক্ত পত্রের আলোকে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন অনুযায়ী দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার ইরাকে ফের কর্মী প্রেরণের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় ইরাকগামী তিন হাজার কর্মী OEP-অন্তর্ভুক্তির অনুমতি নির্দেশক্রমে প্রদান করা হলো।’

 

অনুসন্ধানে এ চিঠির বিপরীতে বেশ কয়েকটি ডিমান্ড লেটার ( বিএমইটিতে জমা দেওয়া) সংগ্রহ করেছে কালবেলা। গত নভেম্বরের ১৩ তারিখে ইস্যু করা একটি ডিমান্ড লেটারে ইরাকের কোম্পানির নাম দেখানো হয়েছে বারেক আলনুর কোম্পানি (Bareeq_Alnoor_company)। ক্লিনার ওয়ার্কার (পুরুষ) পদের বিপরীতে ৪০০ জন শ্রমিকের ডিমান্ড দেওয়া হয়েছে। বেতন ধরা হয়েছে ৩৫০ ডলার করে। এ ছাড়া ১০ জন কর্মীর বিপরীতে একই বেতনের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া একই চিঠিতে আল-আবরার কোম্পানি নামের আরও একটি কোম্পানির বিপরীতে আরও ৬০০ জন শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা দেখানো হয়েছে। এখানে ৫৮৫ পুরুষ ও ১৫ জন নারী। ক্লিনার ওয়ার্কারের বিপরীতে মাসিক বেতন দেখানো হয় ৩৫০ টাকা। এই কোম্পানিটিকে বারেক আল নূর কোম্পানির সিস্টার কনসার্ন হিসেবে দেখানো হয়েছে। অনলাইনে সার্চ করে ইরাকে এই নামে কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে অনলাইনে ইরাকের সরকারি সার্ভারে বারেকেত আল নূর (Bereket AL Noor) নামে একটি কোম্পানির খুঁজ মেলে। যেটি সে দেশের একটি সোলার কোম্পানি। এ ছাড়া (BAREEQ AL NOOR TYPING) নামের আরও একটি টিকটক আইডি খুঁজে পাওয়া যায়। যে আইডি থেকে ভিডিওতে আগ্রহী মানুষদের বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করা হয়। কেউ বিদেশে যেতে চাইলে তাদের সব ধরনের সহায়তা করারও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

 

এ ছাড়া সিগাল কোম্পানি জেনারেল ট্রেডিং লিমিটেড (seagull company General Trading Limited) নামের একটি কোম্পানি থেকে এক হাজার কর্মীর ডিমান্ড লেটার দেখানো হয়েছে। দুই বছরের কন্ট্রাক্টে প্রতি মাসে কর্মীর বেতন দেখানো হয়েছে ৩৫০ ডলার। ইরাকের সরকারি ওয়েবসাইটে সার্চ করে এ কোম্পানিটিরও কোনো হদিশ পাওয়া যায়নি। তবে কুয়েতভিত্তিক সিগাল জেনারেল ট্রেডিং অ্যান্ড কনট্রাকটিং কো: (Seagull General Trading and Contracting CO) নামের একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

 

এ ছাড়াও টি-২০ ওভারসিজের মাধ্যমে নিয়ম-বিধি না মেনে নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর তথ্য-প্রমাণাদি রয়েছে কালবেলার হাতে। বিএমইটির প্রবেশ-নিষিদ্ধ বহির্গমন বিভাগে নূরজাহানের অবাধ যাতায়াতের একাধিক ভিডিও রয়েছে কালবেলার হাতে।

 

জানতে চাইলে এ বিষয়ে ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান কালবেলাকে বলেন, কম্বোডিয়া ও ইরাকে এর আগেও বহু মানুষ গিয়ে কাজ পায়নি। তারা বিভিন্ন ধরনের দাসত্বের শিকার হয়েছে। এসব নিয়ে বিভিন্ন টেলিভিশন ও পত্রিকায় একাধিকবার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচার হয়েছে। বিএমইটির উচিত—এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ হলে স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু তার (নূরজাহান) বিষয়ে একাধিক অভিযোগ থাকার পরও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? বিএমইটিতে নতুন মহাপরিচালক আসছেন—আমি আশা করব, নতুন মহাপরিচালক সাহেব এসব বিষয় অ্যাড্রেস করে ব্যবস্থা নেবেন। বিএমইটি ব্যবস্থা নিলেও মন্ত্রণালয়ের উচিত অন্তত ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ এসব চক্রের মাধ্যমে বহু মানুষ প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন।

 

দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. তানজির আহমেদ কালবেলাকে বলেন, নূরজাহান ও তার স্বামী আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে দুদকে একাধিক মামলার তদন্ত চলছে। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অনুসন্ধান ও তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনের আলোকে কমিশনের অনুমোদনক্রমে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাদিক মাহমুদ কালবেলাকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে—ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে কাজ করার সুবাদে উনি একটি অদৃশ্য শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। সেই অদৃশ্য সিন্ডিকেটই উনাকে সব ধরনের প্রটেকশন দিয়ে থাকে। যে কারণে এত এত অভিযোগ থাকার পরও উনার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। যেহেতু দুদক আগে অনুসন্ধান করে মামলা করে, তাই দুদকের মামলার মানেই হলো—উনি প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত। দেশের মানুষের জান ও মালের নিরাপত্তার স্বার্থে ওই মামলাগুলোকে বিবেচনা করে উনার লাইসেন্স দ্রুত বাতিল করা উচিত। এর পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিএমইটির যেসব কর্মকর্তা উনার অদৃশ্য সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত, তাদের সবাইকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নূরজাহান ও তার স্বামী আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে একাধিক মামলা ও বেশ কয়েকটি অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। এর মধ্যে এ দম্পতির বিরুদ্ধে দুটি মামলা চূড়ান্ত পর্যায়ে চার্জশিট অনুমোদনের জন্য রয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা এ দম্পতির একাধিক ব্যাংক হিসাব এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রেখেছে। কালবেলার অনুসন্ধানে এ দম্পতির বিপুল পরিমাণ স্থাবর-সম্পদের তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাট ক্রয়ের মাধ্যমে তারা উল্লেখযোগ্য সম্পদ গড়ে তুলেছেন, যার অনেক ক্ষেত্রেই দলিলমূল্য ও বাস্তব বাজারমূল্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে—ঢাকা জেলার সাবেক রমনা থানার বর্তমান হাতিরঝিল থানার অন্তর্গত সাবেক শহর খিলগাঁও, বর্তমানে সিদ্ধেশ্বরী মৌজার ঢাকা সিটি জরিপ দাগ নং-৯৮১-এ মিরবাগের হোল্ডিং নং-১৪/ই-তে নির্মিত ‘কসমোপলিটন হালিম নিবাস’-এর অষ্টম তলার (লেভেল-৮) উত্তর-পশ্চিম পাশের ১৪১৫ বর্গফুট আয়তনের ‘এ-৭’ নম্বরের একটি ফ্ল্যাট। নিচতলায় একটি কার পার্কিং স্পেসসহ এ ফ্ল্যাটটির দলিলে মূল্য দেখানো হয়েছে ৪১ লাখ টাকা, যদিও বাস্তবে এর বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

 

এ ছাড়া খিলগাঁও থানার অন্তর্গত গোড়ান মৌজার সিটি জরিপ দাগ নং-১১৫৮-এ আড়াই কাঠা জমির সন্ধান পাওয়া গেছে। এটি ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের বনশ্রী নিউটাউন প্রকল্পের আওতাধীন ‘দক্ষিণ বনশ্রী (গোড়ান)’ এলাকায় অবস্থিত (লে-আউট প্লট নং-এফ/২৫, রোড নং-১০/১, ব্লক-এফ)। দলিল অনুযায়ী, নূরজাহান আক্তার ও তার স্বামী মো. আব্দুস সাত্তার যৌথভাবে এ জমি ক্রয় করেন, যেখানে ২ দশমিক ৫০ কাঠা জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ৪৪ লাখ টাকা। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমান বাজারদরে এই জমির মূল্য ২ কোটি টাকার বেশি। একইভাবে, উত্তর মেরাদিয়া (বর্তমান আফতাবনগর প্রকল্প এলাকা) মৌজায় একাধিক জমি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে ৫ কাঠা জমির একটি প্লট (প্লট নং-এফ/০২, রোড নং-০১, অ্যাভিনিউ-৮, সেক্টর-১) ছয়জনের সঙ্গে যৌথভাবে কেনা হয়, যার মধ্যে নূরজাহান আক্তারের অংশ ২০৬ দশমিক ২৫ অযুতাংশ। এ অংশের দলিলমূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ১৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে একই এলাকায় আরও একটি ছোট অংশের জমি (৮২ অযুতাংশ) ক্রয়ের তথ্য পাওয়া যায়, যেখানে তার অংশ ১৩ দশমিক ৬৬ অযুতাংশ দেখানো হয়েছে। তবে বাস্তবে এ জমির দাম কোটি টাকার ওপরে।

 

রাজধানীর পল্টন থানার দক্ষিণ শহর খিলগাঁও মৌজায় একটি বহুতল ভবনের পঞ্চম তলার ১২৭০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কেনার তথ্যও মিলেছে। দলিলে এর মোট মূল্য দেখানো হয়েছে ৩২ লাখ টাকা, যার অর্ধেক মালিকানা নূরজাহান আক্তারের নামে। বাকি অর্ধেক তার ভাই আব্দুর রহমানের স্ত্রী শাম্মি আক্তারের নামে দলিল করা হয়েছে। তবে ফ্ল্যাটটির মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা বলে জানা গেছে। ঢাকার বাইরে সাভারের আশুলিয়া এলাকায় একাধিক জমি ক্রয়ের তথ্যও মিলেছে। যার মধ্যে আশুলিয়া এলাকায় সাবকবলা দলিল নম্বর ৯৬২০, তারিখ ২০-৬-১৭, ০৮২৫ অযুতাংশ, জমি রেজিস্ট্রেশন ফি দেখানো হয়েছে ৫৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া একই এলাকায় সাবকবলা দলিল নম্বর: ১০৯০১; ৫ শতাংশ জমি নূরজাহান আক্তার ও তার বোন তাহমিনা আক্তারের নামে দলিলমূল্য দেখানো হয়েছে ৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া ধামসোনা ইউনিয়নের পলাশবাড়ি ও বাঁশবাড়ি মৌজায় কয়েকটি দাগে জমি ক্রয় করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি জমির ওপর পাঁচতলা ভবন নির্মাণের ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৯৫ লাখ টাকা। জমি ও নির্মাণ ব্যয়সহ মোট বিনিয়োগ দেখানো হয় প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বেশি। এ ছাড়া কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দক্ষিণ বাঙ্গরা মৌজায় নাল জমির অংশ ক্রয়, ঢাকার পলাশবাড়ি মৌজায় আরএসদাগ নং-৩০৪-এ ৩ শতাংশ জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ২২ লাখ টাকা। এবং সিদ্ধেশরী এলাকায় ফ্ল্যাটের অংশ দানসূত্রে প্রাপ্তির তথ্যও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ঢাকা জেলার মিরপুর থানার সেনপাড়া পর্বতা মৌজার সিটি জরিপ দাগ নম্বর ৫১০৮০ তে ৬৬ অযুতাংশ জমি ১১ লাখ টাকায় দলিল দেখানো হয়েছে। অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, কিছু সম্পতি সরাসরি নিজের নামে না রেখে আত্মীয়স্বজনের নামে করা হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে, যা বেনামি সম্পদের ইঙ্গিত দেয়। দলিলমূল্য অনেক কম দেখানো হলেও বাস্তবে এসব সম্পত্তির মূল্য কোটি কোটি টাকা।

 

এ ছাড়া নূরজাহান আক্তারের স্বামী আব্দুস সাত্তারের নামেও বিপুল সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদের মধ্যে ঢাকা জেলার সিদ্ধেশ্বরীতে ১৮৯৫ বর্গফুটের ফ্ল্যাট দেড় শতাংশ জমিসহ। যার বাজারমূল্য দেড় কোটি টাকার বেশি। ঢাকা জেলার পলাশবাড়ি মৌজা-আরএস– ৩০৪/৩০৪, ৩ শতাংশের একটি প্লট, সাভারের বাঁশবাড়ি মৌজায় ৫ শতাংশ জমি, গোড়ানে আড়াই কাঠার প্লট, যার সিটি জরিপ নম্বর ১১৫৮, কুমিল্লার মুরাদ নগরে বিএস: ২০৯৭ দাগে ৫ দশমিক ১৬৫ অযুতাংশ জমির তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে কালবেলার অনুসন্ধানে এ দম্পতির নামে-বেনামে গড়ে ওঠা বিপুল সম্পদের তথ্য-প্রমাণ উঠে এসেছে, যেখানে রয়েছে দলিলমূল্য ও বাস্তব বাজারমূল্যের ব্যবধান, যৌথ ও বেনামি মালিকানা।

 

এ ছাড়া এ দম্পতির ব্যাংকে বেশ কয়েকটি ফিক্সড ডিপোজিটের তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে রয়েছে ওয়ান ব্যাংকের বনশ্রী শাখায় এফডিআর নম্বর ০৩৯৪৫৩০০০০৫** এ ৩০ লাখ টাকা। উত্তরা ব্যাংকের লেডিস ব্রাঞ্চে সাড়ে ৪ লাখ টাকা, উত্তরা ব্যাংক শান্তি নগর শাখায় ৯ লাখ টাকা, হোটেল ইশাখা ইন্টারন্যাশনাল শাখায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা, একই শাখায় দেড় লাখ টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক শান্তি নগর শাখায় ২৫ লাখ টাকার এফডিআর। আরও একটি এফডিআরে ২০ লাখ টাকা রয়েছে। এ ছাড়া ডাচ বাংলা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, এসআইবিএল ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকে ডিপোজিট ও বিপুল পরিমাণে নগদ অর্থ রয়েছে।

 

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নুরজাহান আক্তার ইরাকে তিন হাজার কর্মী পাঠানোর জন্য অনুমোদন পাওয়া রিক্রুটিং এজেন্সি ‘মেসার্স নাহিন ইন্টারন্যাশনাল’ তার কর্মচারীর নামে বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘ও (নাহিন ইন্টারন্যাশনালের মালিক) আমার এখানে আগে চাকরি করত। এখন করে না।’ তবে ডিমান্ড লেটার ভুয়া নয় এবং কোম্পানির অস্তিত্ব আছে বলে দাবি করেন তিনি। সেইসঙ্গে বলেন, আপনার কাছে অভিযোগ যাবে কেন? আপনি কে? অভিযোগ থাকলে বিএমইটি ও মন্ত্রণালয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে। এরপর দুদকের মামলার কথা জিজ্ঞেস করলে অস্বীকার করে একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল শুরু করেন। একপর্যায়ে প্রতিবেদককে মামলার হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তুই আমাকে ফোন দিছিস কেন? আমি কালকেই কোর্টে যাব, তোর বিরুদ্ধে মামলা করব। আমি সাংবাদিকদের ঘৃণা করি। এরপর রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় থাকা বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমিজমা ও ব্যাংকে কোটি টাকার এফডিআরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও উত্তেজিত হয়ে গালাগাল করতে থাকেন। বলেন, ‘পুরা বাংলাদেশ আমার। আমার হাজার কোটি টাকার সম্পদ থাকলে তোর কি?’ এরপর তিনি যে ভাষায় গালাগাল করেছেন, তা পত্রিকায় প্রকাশযোগ্য নয়। গালাগালের একপর্যায়ে ফোন কেটে দেন।

 

পরে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে প্রতিবেদককে আবার মামলার হুমকি দিয়ে গালাগাল করে হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস মেসেজ পাঠান। ভয়েস মেসেজে তিনি, দৈনিক কালবেলা বন্ধ করে দেওয়ারও হুমকি দেন।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *