রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র সত্তাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সাধারণভাবে এবং উম্মতে মুহাম্মদির জন্য বিশেষভাবে আদর্শ ও অনুসরণীয় নমুনা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—لقد كان لكم في رسول الله اسوة حسنة
‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব : ২১)
এই আয়াতে এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মানুষের জীবনে যেকোনো পরিস্থিতিই আসুক না কেন, রাসূল ﷺ-এর পবিত্র জীবন থেকে সে তার জন্য পথনির্দেশনা ও জীবনচলার নমুনা খুঁজে পাবে। সে বিজয়ী হোক বা পরাজিত, সফল হোক বা ব্যর্থতার সম্মুখীন, ধনী হোক বা দরিদ্র, বন্ধুদের মাঝে থাকুক বা শত্রুদের বেষ্টনীতে, আপনজনদের মধ্যে থাকুক বা অপরিচিতদের মাঝে, সর্বাবস্থায় সিরাতে তাইয়্যিবা তার জন্য পথের প্রদীপ ও সঠিক পথের দিশারী।
সম্ভবত এ কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁর এই প্রিয় ও মনোনীত বান্দাকে নানারকম পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেছেন। উম্মতের উপর ভবিষ্যতে যেসব বিপদ-আপদ আসতে পারে, তার প্রায় সবকিছুর সঙ্গেই রাসূল ﷺ-কে পরিচিত করা হয়েছে। যেন এমন পরিস্থিতিতে মুসলমানরা নবুওয়তের আলো থেকে বঞ্চিত না হয় এবং অন্য কোনো বাতি থেকে পথের আলো ধার করতে বাধ্য না হয়।
বর্তমানে ভারতের মুসলমানরা যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সে প্রেক্ষাপটে সিরাতের একটি বিশেষ ঘটনা অধ্যয়ন করা এবং সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। আর সেটি হলো “হিলফুল ফুযূল”-এর ঘটনা।
ঘটনার সারসংক্ষেপ হলো, রাসূল ﷺ নবী হিসেবে প্রেরিত হওয়ার পূর্বে একবার ইয়েমেনের বনু যুবাইদ গোত্রের এক ব্যক্তি মক্কায় আসেন এবং আস ইবনে ওয়াইল সাহমীর কাছে তার ব্যবসায়িক পণ্য বিক্রি করেন। কিন্তু আস মূল্য পরিশোধে টালবাহানা শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত অস্বীকার ও জুলুমের পথে চলে যায়।
তখন সেই মজলুম ব্যক্তি এমন সময় আবু কুবাইস পাহাড়ে উঠে উচ্চস্বরে আর্তনাদ করেন, যখন কুরাইশরা কাবা প্রাঙ্গণে বসে থাকত। তিনি বলেন, এক অসহায় প্রবাসী মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে, যে নিজ দেশ ও পরিবার-পরিজন থেকে দূরে হারামের পবিত্র ভূমিতে অবস্থান করছে।
মক্কায় এ ধরনের জুলুম-অত্যাচারের ঘটনা নতুন ছিল না। কিন্তু এই অসহায় মানুষের আর্তনাদ এমন বেদনাভরা ছিল যে, কুরাইশের ন্যায়পরায়ণ ও সহৃদয় ব্যক্তিরা বিচলিত হয়ে পড়েন। এরপর কুরাইশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গোত্র, যেমন বনু হাশিম, বনু মুত্তালিব, আসাদ ইবনে আবদুল উযযা, যুহরা ইবনে কিলাব এবং তামীম ইবনে মুররাহর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে সমবেত হন।
তারা পারস্পরিকভাবে এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হন যে, মক্কায় কোনো মজলুম ব্যক্তি অত্যাচারের শিকার হলে, সে স্থানীয় হোক বা বহিরাগত, সবাই সম্মিলিতভাবে তার পাশে দাঁড়াবে এবং জালিমকে ন্যায় দিতে বাধ্য করবে। এই ঐতিহাসিক চুক্তির নাম রাখা হয় ‘হিলফুল ফুযূল’।
এই নামকরণের কারণ সম্পর্কে কেউ কেউ বলেন, ‘ফযল’ শব্দের অর্থ অতিরিক্ত বা বর্ধিত অধিকার। যেহেতু এ চুক্তিতে বলা হয়েছিল, কারো ন্যায্য অধিকার অন্যের কাছে বাকি থাকলে তা আদায় করে দেওয়া হবে, তাই এর নাম রাখা হয় ‘হিলফুল ফুযূল’। আবার অন্যদের মতে, এ চুক্তিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ‘ফযল’, ‘ফুযালা’ ও ‘মুফাযযাল’ নামের কয়েকজন ব্যক্তি ছিলেন, তাই এ নামকরণ করা হয়।
এই চুক্তির গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত গভীর। কারণ সে সময় আরব উপদ্বীপে কোনো কেন্দ্রীয় সরকার ছিল না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাও ছিল না। বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে তীব্র গোত্রবাদ বিরাজ করত। প্রত্যেকে শুধু নিজেদের পরিবার ও গোত্রের স্বার্থ রক্ষা করত। কিন্তু দুর্বল বা বহিরাগত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না।
এমন পরিস্থিতিতে “হিলফুল ফুযূল” ছিল আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং দুর্বল মানুষকে শক্তিশালীদের জুলুম থেকে রক্ষার একটি সংগঠিত ও কার্যকর প্রচেষ্টা। এর গুরুত্ব আরও বেশি ছিল এ কারণে যে, এতে কুরাইশের বহু শক্তিশালী গোত্র অংশগ্রহণ করেছিল। যদি অল্প কয়েকজন ব্যক্তি বা দুর্বল কোনো গোত্র এ উদ্যোগ নিত, তবে তার বিশেষ প্রভাব পড়ত না। কিন্তু মক্কার শক্তিশালী পরিবারগুলোর সম্মিলিত অবস্থান উপেক্ষা করা সহজ ছিল না।
এ কারণেই এই চুক্তি আইনহীন পরিবেশে ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার একটি ইতিবাচক ও সফল উদ্যোগে পরিণত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও এ চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরও তিনি বলতেন, আজও যদি আমাকে এ ধরনের চুক্তির দিকে আহ্বান করা হয়, আমি অবশ্যই তা গ্রহণ করব।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেছেন, ‘এই চুক্তিতে অংশগ্রহণ না করার বিনিময়ে যদি আমাকে লাল উটও দেওয়া হতো, তবুও আমি তা পছন্দ করতাম না।’
ভারতের মুসলমানরা আজ যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং রাজনৈতিকভাবে যে একাকীত্বের শিকার, সে প্রেক্ষাপটে সীরাতের এই ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে এবং তাদের সংকট উত্তরণের পথ দেখায়।
‘হিলফুল ফুযূল’ কেমন পরিস্থিতিতে গঠিত হয়েছিল? এমন এক সময়ে, যখন জালিমকে থামানোর মতো কোনো শক্তি ছিল না, মজলুমের ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো পথ ছিল না, অন্যায় ছিল কিন্তু অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো সংগঠিত প্রতিরোধশক্তি ছিল না।
এই চুক্তির উদ্দেশ্য কী ছিল? সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, দুর্বলদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং জুলুম থেকে তাদের রক্ষা করা।
এর পদ্ধতি কী ছিল? জনগণের সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে জালিমের হাত থামানো, সামাজিক ঐক্যের মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা এবং ছোট ছোট শক্তিকে একত্র করে একটি বড় শক্তিতে রূপান্তরিত করা, যাতে জুলুম প্রতিহত করা যায় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজ আমাদের দেশেও একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জুলুমের রক্তাক্ত থাবা এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে প্রকাশ্যে রক্তপাত ঘটছে, মানুষের সম্পদ লুট করা হচ্ছে, সম্মান ও মর্যাদা পদদলিত করা হচ্ছে, জনপদ ধ্বংস করা হচ্ছে এবং মানুষের লাশের উপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতার দুর্গ নির্মাণের চেষ্টা চলছে।
এমন পরিস্থিতিতে তো মানুষের বিবেক জেগে ওঠার কথা ছিল। প্রতিটি জবান জালিমকে ধমক দিত, প্রতিটি হাত তাকে থামাতে এগিয়ে আসত এবং প্রতিটি চোখ ঘৃণা ও ক্রোধে জ্বলে উঠত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জালিমদের সমর্থনে স্লোগান দেওয়া হচ্ছে, গণমাধ্যম অপরাধীদের ফেরেশতা বানিয়ে উপস্থাপন করছে এবং ন্যায়বিচারের হত্যাকারীদের নায়ক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
এ অবস্থায় মুসলমানদের করণীয় হলো, নিজেদের অভ্যন্তরীণ মতভেদ উপেক্ষা করে অন্তত একটি মৌলিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে একমত হওয়া। লক্ষ্য হবে সাম্প্রদায়িক শক্তির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা এবং এমন কৌশল গ্রহণ করা, যাতে আগামী নির্বাচনে ধর্মনিরপেক্ষ ও ন্যায়পন্থী প্রার্থীরা সফল হতে পারেন।
যেভাবে জাতীয় ঐক্য গঠন করা উচিত:
জাতীয় ঐক্যের এই প্রচেষ্টার পাশাপাশি অন্তত আরও তিনটি শ্রেণিকে সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষত শিখ ও খ্রিস্টান সমাজ, যারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব রাখে।
দ্বিতীয়ত, দলিত সম্প্রদায়, যারা যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত ও নির্যাতিত জীবন যাপন করছে এবং যাদের অনেকেই মনে করে, তাদের জোরপূর্বক হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, ন্যায়পন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দু নাগরিকরা। কারণ আজও বহু হিন্দু নাগরিক দেশের সাম্প্রদায়িক মোড় নেওয়ায় উদ্বিগ্ন ও মর্মাহত।
যদি মুসলমানরা এই তিনটি শ্রেণিকে সঙ্গে নিয়ে একটি নতুন “হিলফুল ফুযূল” গড়ে তুলতে পারে, এমন একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করতে পারে যা প্রতিটি জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে এবং প্রতিটি মজলুমের পাশে থাকবে, তবে তা হবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এক বিশাল সাফল্য।
কোনো দলিত নির্যাতনের শিকার হলে মুসলমানরা শান্তিপূর্ণভাবে তার প্রতিবাদ করবে, আবার কোনো মুসলমান আক্রান্ত হলে দলিত সমাজ তার পাশে দাঁড়াবে। এ ধরনের পারস্পরিক সহযোগিতা ও ন্যায়ভিত্তিক ঐক্য বর্তমান সংকটের কার্যকর সমাধান হতে পারে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ন্যায়, নিরাপত্তা ও সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অমুসলিম স্বদেশবাসীদের সঙ্গেও বিভিন্ন চুক্তি করেছিলেন। মক্কায় তিনি পারস্পরিক সহাবস্থানের আহ্বান জানিয়েছিলেন। সূরা কাফিরুনে সেই নীতির প্রতিফলন দেখা যায়। পরে মদীনায় এসে তিনি মুসলমান, ইহুদি ও মুশরিক গোত্রগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক “মীসাকে মদীনা” সম্পাদন করেন।
‘হিলফুল ফুযূল’ যদিও নবুওয়তের পূর্বেকার ঘটনা, তবুও রাসূল ﷺ পরবর্তীকালে এর প্রশংসা করেছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, এটি কেবল সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল ছিল না; বরং ইসলামের ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নীতিগত অবস্থান ছিল।
দেশকে রক্ষা করা, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে টিকিয়ে রাখা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা শুধু মুসলমানদের রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়; বরং ‘খাইরে উম্মত’ হিসেবে এটি তাদের নৈতিক দায়িত্বও।
তাই সাময়িক ও ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে এ প্রচেষ্টা হতে হবে সুপরিকল্পিত, কিন্তু প্রচারবিমুখ। কারণ এ ধরনের কাজে অতিরিক্ত প্রচারণা উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি ডেকে আনে।
বর্তমানে দেশ এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণের পথ, যা দেশকে স্থায়ীভাবে বিভাজন ও বিদ্বেষের দিকে ঠেলে দিতে পারে। অন্যদিকে রয়েছে ন্যায়পন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোকে একত্রিত করে অন্যায় ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথ।
মুসলমানদের উচিত দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়া এবং এমন একটি সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা, যেখানে ন্যায়, সহাবস্থান ও মানবিক মর্যাদা সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত হবে।
অনুবাদ: সলিমুদ্দিন মাহদী কাসেমী
Leave a Reply