দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা, মারধর, হুমকি ও সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতার পালাবদলের এই সময়ে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের নাম এসব ঘটনায় জড়িয়ে পড়ায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক কর্মীদের এমন দাপট ও হামলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
গত ২৯ আগস্ট ঝিনাইদহে ডেইলি স্টারের জেলা প্রতিনিধি ওমর আলী সোহাগ হামলার শিকার হন। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের একটি অনুষ্ঠানে সংবাদ সংগ্রহের সময় তিনি এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবের সভাপতি ও জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসিফ ইকবাল মাখন তাঁকে সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ তুলে অপমান করেন। এরপর ছাত্রদলের ১৫ থেকে ২০ জন কর্মী তাঁকে মারধর করেন।
শরীয়তপুরেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিএনপির কর্মসূচিতে ডেইলি স্টারের জাহিদ হাসান, নিউজ টুয়েন্টিফোর ও জাগো নিউজের বিধান মজুমদার এবং মানবকণ্ঠের বরকত মোল্লা মারধরের শিকার হন। অভিযোগ রয়েছে, জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে এই হামলা চালানো হয়। এর আগে বি এম ইসরাফিল নামের আরেক সাংবাদিক হামলায় গুরুতর আহত হয়ে কবজি ভেঙে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন। এসব ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে গেলে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে, অথচ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পাল্টা চাঁদাবাজির অভিযোগ দ্রুত তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। আইনের চোখে উভয় পক্ষ সমান হলেও পুলিশের এমন বৈষম্যমূলক আচরণ নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এছাড়া দোহারে শ্রমিক দলের এক নেতার বিরুদ্ধে সাংবাদিক নুরুল ইসলামকে মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। টিকিটের সিরিয়াল নিয়ে বিরোধের জেরে পরিচয় জানার পর তাঁকে মারধর করা হয়। যদিও বিএনপির স্থানীয় নেতারা এসব ঘটনাকে অন্যায় বলে অভিহিত করেছেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে শুধু নিন্দা বা ‘ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই; অভিযুক্তরা দলীয় পদে থাকলে তদন্তের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানি ছিল নিয়মিত বিষয়, যা ছিল তৎকালীন কর্তৃত্ববাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ। নাগরিকেরা সেই পুরোনো ধারায় ফিরতে চান না। সরকার, প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের অনিয়ম তুলে ধরা সাংবাদিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো সংবাদ নিয়ে আপত্তি থাকলে তা আইনি প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা করতে হবে, হামলা বা ভয় দেখিয়ে নয়। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলে এসেছে, এখন ক্ষমতায় থেকে সেই অঙ্গীকারের বাস্তব পরীক্ষা দেওয়ার সময় তাদেরই এসেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আইনের চোখে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষই সমান; কিন্তু কোনো পক্ষের অভিযোগ গ্রহণে গাফিলতি এবং অন্য পক্ষের অভিযোগে তৎপরতা দেখা দিলে পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখানে প্রশ্ন শুধু একজন সাংবাদিককে মারধরের নয়; রাজনৈতিক প্রভাবের জোরে কেন একজন সাংবাদিককে তাঁর দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হলো।
Leave a Reply