কক্সবাজারে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের সময় নিজের পরিচয় গোপন করে পূর্বপরিচিত এক ব্যক্তির নাম-ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন এক মাদক কারবারি। সেই জালিয়াতির কারণে বর্তমানে এক নিরপরাধ দিনমজুর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। অথচ প্রকৃত আসামি রমজান এখনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। গত মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর থানা-পুলিশ এ চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
কারাগারে থাকা ভুক্তভোগী সোনা মিয়া আদালতে আবেদন করে জানান যে, তিনি এই মামলার প্রকৃত আসামি নন। আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানা-পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে গত ৫ জুলাই একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে, ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম মো. রমজান। তিনি নিজের পরিচয় লুকাতে সোনা মিয়ার নাম ও জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করেছিলেন। বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়া এই মামলার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২ মার্চ কক্সবাজার সদর থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে সোনা মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়, যার পিতার নাম মৃত নজির আহমদ এবং ঠিকানা কুতুবদিয়াপাড়া, কক্সবাজার ও গর্জনিয়া, রামু। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন ডিবির পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মানস বড়ুয়া আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। এরপরও আসামির তালিকায় নাম থেকে যায়। এ বিষয়ে জানতে তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা মানস বড়ুয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আদালত এই মামলায় সোনা মিয়াসহ পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। পলাতক আসামি সোনা মিয়ার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি হলে র্যাব-১৫ রামু থেকে সোনা মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। এরপরই প্রকৃত ঘটনা সামনে আসে। তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া রমজানের বয়স ছিল ২৫ বছর, আর বর্তমান সোনা মিয়ার বয়স ৩৪ বছর। রমজান ও সোনা মিয়া একসময় রোহিঙ্গা শিবিরে এবং পরে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে থাকতেন, যে সুবাদে রমজান সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন সনদের তথ্য হাতিয়ে নেন।
পুলিশের তদন্তে দুই ব্যক্তির শারীরিক ও ব্যক্তিগত তথ্যে ব্যাপক অমিল পাওয়া গেছে। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ভুয়া সোনা মিয়ার পিতার নাম মৃত নজির আহমদ হলেও তার মায়ের নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। তার উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি ও ওজন ৫০ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে দুই গাল ও ডান বাহুতে ক্ষতচিহ্নের কথা বলা হয়েছিল। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া প্রকৃত সোনা মিয়ার মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন, স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস এবং তাদের এক ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। তার উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি ও ওজন ৪২ কেজি। তার শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহু, পেটের বাঁ পাশে ও পিঠের মাঝখানে তিল রয়েছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মো. আলী জেলা কারাগারে গিয়ে উভয় ব্যক্তির ছবি, আঙুলের ছাপ ও শনাক্তকরণ চিহ্ন যাচাই করে কোনো মিল পাননি। এছাড়া মামলার অন্য আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, বর্তমান সোনা মিয়াকে তারা চেনেন না। তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, বর্তমান সোনা মিয়া এর আগে কখনো গ্রেপ্তার হননি বা কারাগারে বন্দী ছিলেন না।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মন্নান বলেন, তদন্ত থেকে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তার চরম গাফিলতি ছিল। অন্য ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন যাচাই না করেই অভিযোগপত্র দেওয়ায় প্রকৃত আসামি রমজান পালিয়ে গেছেন এবং নিরপরাধ সোনা মিয়া কারাগারে বন্দী হয়েছেন। এটি অত্যন্ত অমানবিক এবং এ ঘটনার যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, কারাগারে থাকা সোনা মিয়া যে প্রকৃত আসামি নন, সে বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদনের ওপর আদালতের কোনো আদেশ এখনো পাওয়া যায়নি। এদিকে ভুক্তভোগী সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, তার স্বামী একজন খেটে খাওয়া মানুষ। রমজান নামের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রেই আজ তার স্বামী অন্যের অপরাধের খেসারত দিচ্ছেন। তিনি দ্রুত তার স্বামীর মুক্তি ও ঘটনার সুরাহা দাবি করেছেন।
Leave a Reply