ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের জোকা অংশে রাস্তাটি ছিল বেশ সরু। দুই পাশে ধানখেত ও নিচু জমির মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া সেই পিচের রাস্তায় ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট বিকেলে মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকার দিকে ফিরছিল একটি মাইক্রোবাস। গাড়িতে ছিলেন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরসহ আরও তিনজন। তারা সেখানে গিয়েছিলেন ‘কাগজের ফুল’ সিনেমার লোকেশন দেখতে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ নিয়ে নির্মিতব্য এই সিনেমার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই ছিল তাদের সেই সফর। ফেরার পথে বিপরীত দিক থেকে আসা চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর।
একজন চলচ্চিত্রকারের মৃত্যু হলো তার পরবর্তী সিনেমার লোকেশন দেখে ফেরার পথে। এই তথ্যটুকুর মধ্যেই যেন তার জীবনের শেষ দৃশ্যের ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে। যিনি সারাজীবন অন্যের জীবন, ইতিহাস ও সমাজকে ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করেছেন, তার নিজের জীবন থমকে গেল এমন এক জায়গায়, যেখানে তিনি গিয়েছিলেন নতুন কোনো গল্পের সন্ধানে।
তারেক মাসুদের জন্ম ১৯৫৬ সালে ফরিদপুরের ভাঙ্গায়। তার শৈশবের একটি বড় অংশ কেটেছে মাদ্রাসায়। সেই সময়ের কঠোর নিয়মকানুন ও পৃথিবী দেখার সীমাবদ্ধতা তার পরবর্তী কাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে ‘মাটির ময়না’ সিনেমায় তার শৈশবের সেই অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ার সময় চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে, যা তার সৃজনশীলতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। নড়াইলের নিভৃতচারী সুলতানের জীবন ও কর্ম নিয়ে তিনি ১৯৮৯ সালে নির্মাণ করেন ‘আদম সুরত’। এই তথ্যচিত্রটি সুলতানের জীবন ও চিন্তার গভীরে প্রবেশের এক অনন্য প্রয়াস ছিল।
১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় তারেক মাসুদের অন্যতম আলোচিত কাজ ‘মুক্তির গান’। আমেরিকান চলচ্চিত্রকার লেয়ার লেভিনের ১৯৭১ সালে ধারণ করা ফুটেজ নিয়ে তিনি এই সিনেমাটি তৈরি করেন। দীর্ঘদিন নিউ ইয়র্কে পড়ে থাকা সেই ফুটেজ খুঁজে বের করে ক্যাথরিন মাসুদ ও তারেক মাসুদ সেগুলোকে একটি নতুন গল্পের কাঠামোয় সাজান। ‘মুক্তির গান’-এ যুদ্ধকে কেবল সংঘাত হিসেবে নয়, বরং গান গাইতে থাকা একদল তরুণের চোখ দিয়ে দেখা হয়েছে। এই সিনেমার পর ‘মুক্তির কথা’ প্রকল্পের মাধ্যমে তারা ট্রাকে করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সাধারণ মানুষের সামনে সেই ফুটেজ প্রদর্শন করেছিলেন।
তারেক মাসুদের প্রতিটি কাজে তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদের অবদান ছিল অপরিসীম। সম্পাদনা, প্রযোজনা ও পরিচালনার প্রতিটি ধাপে তাদের যৌথ অংশগ্রহণ ছিল নিবিড়। যদিও চলচ্চিত্র জগতে অনেক সময় পর্দার পেছনের মানুষরা আড়ালে পড়ে যান, কিন্তু তাদের কাজের সম্পর্কটি ছিল গভীর সহযোগিতার।
২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মাটির ময়না’ তারেক মাসুদের ক্যারিয়ারে এক বড় মাইলফলক। ছবিটির আনু চরিত্রটিতে তার নিজের শৈশবের ছায়া স্পষ্ট। এটি কেবল মাদ্রাসার গল্প নয়, বরং একটি পরিবার, একটি শিশুর বেড়ে ওঠা এবং একটি দেশের ভাঙনের দলিল। কান চলচ্চিত্র উৎসবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিকস উইকে পুরস্কার পেলেও দেশে সিনেমাটি সেন্সর জটিলতার মুখে পড়েছিল। এরপর ২০০৬ সালে ‘অন্তর্যাত্রা’ এবং ২০১০ সালে ‘রানওয়ে’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি প্রবাস জীবন ও সমকালীন বাংলাদেশের ধর্মীয় উগ্রবাদের মতো জটিল বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
২০১১ সালে তিনি দেশভাগ নিয়ে ‘কাগজের ফুল’ সিনেমার কাজে হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু মানিকগঞ্জের সেই দুর্ঘটনায় তার জীবন ও স্বপ্ন—দুটোই অসমাপ্ত রয়ে যায়। ক্যাথরিন মাসুদ পরে ছবিটি শেষ করার কথা বললেও একজন পরিচালকের অনুপস্থিতিতে সেই কাজ সম্পন্ন করা অত্যন্ত কঠিন। তারেকের ফিল্মোগ্রাফি সংখ্যায় খুব বড় না হলেও প্রতিটি কাজ ছিল গভীর প্রশ্নবোধক। তিনি ইতিহাসকে কেবল সংগ্রহ করেননি, বরং মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র আলোচনা ও আন্দোলন হয়েছিল। ক্ষতিপূরণ, সড়ক আইন, চালকদের প্রশিক্ষণ ও মহাসড়কের নিরাপত্তার দাবি উঠেছিল। কিন্তু এত বছর পরও বাংলাদেশের সড়কব্যবস্থার অনেক পুরোনো সমস্যা রয়ে গেছে। একজন মানুষ যিনি সারাজীবন সমাজের অসংগতি ক্যামেরায় তুলে ধরেছেন, তার নিজের মৃত্যুও শেষ পর্যন্ত আমাদের সড়কব্যবস্থার দুর্বলতার এক করুণ স্মারক হয়ে রইল।
মিশুক মুনীর ছিলেন একজন মেধাবী সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহক। বিবিসির হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কাজ করার সময় ক্যামেরার পেছনে তিনি নিজস্ব এক ভাষা তৈরি করেছিলেন। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট একই রাস্তা তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর—উভয়ের জীবন থামিয়ে দেয়। প্রতি বছর ১৩ আগস্ট তাদের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই অসমাপ্ত সিনেমার কথা, যা আর কখনো আলোর মুখ দেখেনি।
জোকার সেই রাস্তা দিয়ে এখনো বাস ও ট্রাক চলে। ধানখেত ও নিচু জমিগুলো এখনো আগের মতোই আছে। হয়তো রাস্তার চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু কোনো রাস্তা আসলে মানুষের স্মৃতি ধরে রাখে না। মানুষই স্মৃতি ধরে রাখে। তাই ১৩ আগস্ট এলে কেবল তারেক মাসুদের মৃত্যুর কথা নয়, বরং তার রেখে যাওয়া কাজ ও অসমাপ্ত স্বপ্নের কথা বারবার মনে পড়ে যায়।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ নিয়ে যে সিনেমাটা তারেক বানাতে চেয়েছিলেন, তার প্রস্তুতি চলছিল তখন।
তারেক মাসুদের শুরুটা অবশ্য সিনেমা দিয়ে হয়নি।
শৈশবের একটা বড় সময় কেটেছে মাদ্রাসায়।
কী শেখা হবে, কীভাবে শেখা হবে, কোন প্রশ্ন করা যাবে—সবকিছুরই একটা সীমা ছিল।
বরং ‘মাটির ময়না’য় সেটা সরাসরি ফিরে আসে।
অন্য ছবিগুলোতেও ফিরে আসে অন্যভাবে—কখনো বিশ্বাসের প্রশ্ন হয়ে, কখনো ইতিহাসের, কখনো সমাজের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়তে এসে তার সামনে আরেক ধরনের পৃথিবী খুলে যায়।
সেখানেই পরিচয় হয় চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের সঙ্গে।
নড়াইলে প্রায় নিভৃত জীবন কাটানো সুলতান কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষকে বিশাল শরীর দিয়ে আঁকতেন।
তার ছবির মানুষগুলো বাস্তবের মানুষ, অথচ বাস্তবের মতো নয়।
শরীর বড় হয়েছে, শক্তি বড় হয়েছে, যেন তাদের জীবনটাকেও তিনি বড় করে দেখতে চাইছেন।
তারেক তাকে নিয়ে বানালেন ‘আদম সুরত’ (১৯৮৯)।
ছবিটি তার পরের কাজগুলোর তুলনায় কম আলোচিত।
কিন্তু তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রজীবন বুঝতে গেলে এখানেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পাওয়া যায়।
সুলতানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়তো তাকে আরেকটা জিনিস শিখিয়েছিল—বাস্তবকে দেখার জন্য সবসময় বাস্তবের হুবহু অনুকরণ করতে হয় না।
তারপর পুরোনো ছবিগুলোকে নতুন একটি গল্পের মধ্যে বসান।
তারা ঘুরছে, গান গাইছে, মানুষকে সংগঠিত করছে।
ট্রাকে করে সিনেমার সরঞ্জাম নিয়ে গেছেন, গ্রামের মাঠে পর্দা টাঙিয়ে মানুষকে ছবি দেখিয়েছেন।
১৯৭১-এর সময় যে মানুষটি কিশোর ছিলেন, হয়তো তিনি বহু বছর পর পর্দায় নিজের সময়টাকে আবার দেখছেন।
‘মুক্তির গান’সহ তাদের কাজগুলোতে দুজনের অবদান আলাদা করে মাপা সবসময় সহজ নয়।
কারণ তাদের কাজের সম্পর্কটা শুরু থেকেই সহযোগিতার ছিল।
তবু স্মৃতিতে তারেকের নামই বেশি জায়গা দখল করে।
চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও এটা নতুন কিছু নয়—পর্দায় যাকে দেখা যায়, তার নামটাই বেশি মনে থাকে; পেছনে থাকা মানুষগুলো ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যান।
তারেক নিজের শৈশবে সবচেয়ে সরাসরি ফিরে গেলেন ‘মাটির ময়না’য়।
মাদ্রাসায় পড়তে যাওয়া একটি বালক, যার চারপাশের পৃথিবী ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।
পরিবারে টানাপোড়েন, ধর্মীয় শিক্ষা, গ্রামবাংলার জীবন, ১৯৭১-এর রাজনীতি—সবকিছু তার চোখের সামনে দিয়ে যাচ্ছে।
ছবিটাকে শুধু মাদ্রাসার গল্প বললে তার অনেকটাই বাদ পড়ে যায়।
এটা একইসঙ্গে একটি পরিবারের গল্প, একটি শিশুর বড় হয়ে ওঠার গল্প এবং একটি দেশের ভাঙনের গল্প।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য সেটা ছিল বড় একটি স্বীকৃতি।
বিদেশে যে ছবিটি প্রশংসা পেল, নিজের দেশেই সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠল।
তিনি এমন বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন যেগুলো নিয়ে কথা বলা বা ছবি বানানো সবসময় সহজ ছিল না।
‘মাটির ময়না’র পর এলো ‘অন্তর্যাত্রা’ (২০০৬)।
দুটো ছবিই ‘মাটির ময়না’র মতো আলোড়ন তুলতে পারেনি।
কিন্তু তার কাজের পরিসর বোঝার জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি শুধু নিজের অতীতের দিকে ফিরে তাকাননি; নিজের সময়কেও বুঝতে চেয়েছেন।
২০১১ সালে আবারও অতীতে ফিরছিলেন তারেক।
‘কাগজের ফুল’ ছিল দেশভাগকে নিয়ে তার বহুদিনের পরিকল্পনা।
আমরা জানি না শেষ পর্যন্ত ছবিটা কেমন হতো।
কোন দৃশ্যগুলো থাকত, গল্প কোথায় গিয়ে থামত, তারেক শেষ পর্যন্ত কী বলতে চাইতেন—এসব প্রশ্নের উত্তর আর কখনো জানা যাবে না।
কিন্তু মানুষের জীবনের যে অংশগুলো সাধারণত বড় ইতিহাসের নিচে চাপা পড়ে যায়, সেদিকেই তার আগ্রহ ছিল।
এই কারণেই তার ফিল্মোগ্রাফি সংখ্যায় বড় না হলেও মনে হয় বিস্তৃত।
কয়েকটি তথ্যচিত্র, কয়েকটি কাহিনিচিত্র, একটি অসমাপ্ত ছবি—ব্যস।
ইতিহাস কি শুধু বইয়ের মধ্যে থাকে, নাকি মানুষের মুখেও থাকে?
একটি পুরোনো ফুটেজ কি আবার নতুন করে কারও স্মৃতি হয়ে উঠতে পারে?
তারেকের ছবিগুলো এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয় না।
২০১১ সালের ১৩ আগস্টের দুর্ঘটনার পর সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আবারও আলোচনা জোরালো হয়েছিল।
এই দিকটা তারেকের মৃত্যুকে আরও কষ্টের করে তোলে।
মিশুক মুনীরের নামও এখানে একইসঙ্গে আসে।
কিন্তু ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট একই রাস্তা তাদের দুজনের জীবনকে একই মুহূর্তে থামিয়ে দেয়।
মনে পড়ে এমন কিছু ছবিকে, যেগুলো তারা রেখে গেছেন।
আর মনে পড়ে একটি ছবির কথা, যেটা তারা শেষ করে যেতে পারেননি।
হয়তো রাস্তার চেহারা বদলেছে, হয়তো আশপাশে আরও বাড়িঘর উঠেছে।
তাই ১৩ আগস্ট তারেক মাসুদের কথা মনে পড়লে শুধু তার মৃত্যুর কথা মনে রাখার ইচ্ছে হয় না।
তার ছবিগুলোর দিকে আবার তাকাতে ইচ্ছে হয়।
‘আদম সুরত’, ‘মুক্তির গান’, ‘মাটির ময়না’, ‘অন্তর্যাত্রা’, ‘রানওয়ে’—একেকটা ছবির ভেতর দিয়ে তিনি একেকটা বাংলাদেশকে দেখেছিলেন।
১৩ আগস্টের বিকেলে যে মানুষটা মানিকগঞ্জ থেকে ফিরছিলেন, তিনি জানতেন না তার নিজের গল্পের শেষ দৃশ্যটা সেদিনই লেখা হয়ে যাবে।
Leave a Reply