চাঁদপুরের হাইমচরের মেঘনা নদীতে জেগে ওঠা চরে গড়ে ওঠা বিতর্কিত ‘টিপুনগর’ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির ভাই জাওয়াদুর রহিম ওয়াদুদ (টিপু) ও তাঁর সহযোগীদের দখলে থাকা প্রায় ৪৮ দশমিক ৫২ একরের এই সম্পত্তিটি বর্তমানে আদালতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আদালতের নির্দেশে হাইমচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বর্তমানে এই স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির রিসিভার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে সম্প্রতি এই সম্পত্তির মাছের ঘের থেকে কোনো ধরনের নিলাম বা সরকারি নিয়ম ছাড়াই মাছ ধরে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সম্প্রতি ঘের থেকে জাল ফেলে কয়েক লাখ টাকার মাছ ধরা হয়েছে, যার কোনো স্বচ্ছ হিসাব বা নিলাম প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বিক্রয়লব্ধ অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে নীলকমল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনির সিকদার বলেন, আদালতের রিসিভারের দায়িত্বে থাকা সম্পত্তি থেকে মাছ বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম ও নিলামপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। নিলাম ছাড়া মাছ বিক্রি হয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
অভিযোগের বিষয়ে হাইমচর থানার ওসি মোহাম্মদ নাজমুল হাসান মাছ বিক্রির কথা স্বীকার করেছেন। তবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তিনি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ঘেরের মাছ ধরা ও বিক্রি করা হয়েছে এবং বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। এদিকে হাইমচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত রায় জানিয়েছেন, টিপুনগরের জমির মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। তিনি বলেন, সরকারি খাসজমি ও মালিকানার বিষয়টি পর্যালোচনার অধীনে থাকায় জায়গাটির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। আদালতের মাধ্যমে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার পরামর্শ চাওয়ার প্রেক্ষিতেই ওসিকে রিসিভার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ছয়টি দলিলের মাধ্যমে জাওয়াদুর রহিম ও তাঁর সহযোগীরা বাহেরচরের এই জমি নিজেদের নামে নিয়ে সেখানে মাছের ঘের, গবাদিপশুর খামার ও বাগান গড়ে তোলেন। জাওয়াদুর রহিমের ডাকনাম অনুসারে এলাকাটি ‘টিপুনগর’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ২০২২ সালের মার্চ মাসে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, চরটিতে দিয়ারা জরিপ না হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় কৃষকদের নামে থাকা জমির কাগজপত্রের ভিত্তিতে নামমাত্র মূল্যে (শতাংশপ্রতি ৪৬৫ টাকা) এই জমি দখল করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে সরকারি জমি উদ্ধারে জেলা প্রশাসন জাওয়াদুর রহিমসহ ২৫ জনকে বিবাদী করে আদালতে মামলা করে। জমি দখলের অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) অনুসন্ধানে নামে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুদকের চাঁদপুর কার্যালয় জানায়, হাইমচর সাবরেজিস্ট্রার ও উপজেলা ভূমি কার্যালয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দলিল তৈরির ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। দুদকের অনুসন্ধানে জাওয়াদুর রহিম ছাড়াও তৎকালীন নীলকমল ইউপি চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন সরদার, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবির পাটওয়ারী, মুনসুর আহমেদ ও আইনজীবী সাইফুদ্দিন বাবুর নাম উঠে আসে। বর্তমানে আইনি লড়াইয়ের অংশ হিসেবেই সম্পত্তিটি আদালতের রিসিভারের অধীনে রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হাইমচরের ৪ নম্বর নীলকমল ইউনিয়নের বাহেরচরে মেঘনা নদীর পশ্চিমে জেগে ওঠা এই চরেই প্রায় ৪৮ দশমিক ৫২ একর জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২২ সালের ২৫ মার্চ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ‘চাঁদপুরে খাসজমিতে টিপুনগর’ শিরোনামে এই জমি দখলের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অথচ এমন কাগজপত্রের ভিত্তিতেই ছয়টি দলিলে মোট ৪ হাজার ৮৫২ শতাংশ বা প্রায় ৪৮ দশমিক ৫২ একর জমি ব্যক্তির নামে নেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু বাহেরচরে সে জরিপ না হওয়ায় ব্যক্তিমালিকানার সুস্পষ্ট ভিত্তি ছিল না।
Leave a Reply