বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলিও অনুমোদিত হয়েছে। বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতনকাঠামো তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। নতুন এই বেতনকাঠামো গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি তথ্য অধিদপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গঠিত সচিব কমিটির সুপারিশের আলোকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভারসাম্যপূর্ণ বেতনকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে এই কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে। অর্থ বিভাগ এখন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনা জারি করবে।
নতুন কাঠামোতে আগের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল থাকছে। তবে বেতন ও ভাতার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে
পুরো বেতনকাঠামো একসঙ্গে কার্যকর না করে দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মূল বেতনের ৪০ শতাংশ গত ১ জুলাই থেকে, পরবর্তী ৩০ শতাংশ আগামী বছরের জানুয়ারিতে এবং বাকি ৩০ শতাংশ আগামী জুলাই মাসে কার্যকর হবে। বিভিন্ন ভাতা এবং অবসরভোগীদের সুবিধা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। বর্তমানে বেতনকাঠামোর সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের অনুপাত ১: ১ দশমিক ৯৪৫, যা কমিয়ে ১: ১ দশমিক ৭৮ করা হয়েছে।
পেনশনভোগীদের জন্য নতুন কাঠামোয় বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। এর আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে পেনশনের হার বাড়ানো হয়েছে। মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশনভোগীরা ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকার বেশি পেনশনভোগীরা ৫৫ শতাংশ হারে বাড়তি সুবিধা পাবেন।
নতুন বেতনকাঠামোয় প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু করা হচ্ছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে এই ভাতা দেওয়া হবে। এছাড়া ডিজিটাল যোগাযোগের ব্যয় মেটাতে সব গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতা যুক্ত করা হয়েছে, যা আগে কেবল পঞ্চম গ্রেড ও তার ওপরের পদের জন্য প্রযোজ্য ছিল।
এই নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক-বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি উপকৃত হবেন। সব মিলিয়ে ৩৩ লাখ মানুষ এই সুবিধার আওতায় আসছেন। এতে সরকারের বছরে বাড়তি ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, যা মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো অনুযায়ী সংস্থান রাখা হয়েছে।
এদিকে, এই বিশাল অংকের অর্থের জোগান দিতে রাজস্ব আদায়ের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঘাটতি ছিল ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরকে এবার ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। রাজস্ব সংস্কারের উদ্যোগগুলো এখনো সেভাবে দৃশ্যমান নয়।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে, যা ২২ শতাংশের নিচে নেমেছে। সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান জানান, ব্যবসা-বাণিজ্যে শ্লথগতি এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে এনবিআর জানিয়েছে, তারা ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বৈঠক শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে তা জানায়। চাকরির আরও তথ্য: অনুমোদনের পটভূমি তুলে ধরে বলা হয়, জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার সুপারিশ প্রণয়নের জন্য একটি সচিব কমিটি গঠন করে। চাকরির আরও তথ্য: প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বিস্তারিত বিধান থাকবে। চাকরির আরও তথ্য: ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮—এই দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে দেওয়া হবে বেতন-ভাতা।
Leave a Reply