নেপালে গত ২৬ আগস্ট আঘাত হানা ভয়াবহ হিমবাহধস, বন্যা ও ভূমিধসে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২৫০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৪ হাজার ৫০০ জন। এই বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ কাটিয়ে উঠতে কয়েক শ কোটি ডলারের প্রয়োজন হতে পারে বলে কাঠমান্ডু থেকে সতর্ক করা হয়েছে।
গত বছরের ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর তরুণদের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে আগের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় এক বছর পর নেপাল এই বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ল। ৩৬ বছর বয়সি প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ, যিনি ‘বালেন’ নামে পরিচিত, মার্চের নির্বাচনে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তবে বর্তমান দুর্যোগ তার নেতৃত্বের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুর্যোগের কয়েক ঘণ্টা পরই প্রধানমন্ত্রী শাহ দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তবে ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর নেপালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই দুর্যোগের এক সপ্তাহ পার হলেও, জাতির উদ্দেশে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না আসায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষক ব্রায়ান ব্রাউন মনে করেন, বালেন্দ্র শাহের প্রতি তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে নতুন কিছু নিয়ে আসবেন—এমনটাই ছিল মানুষের আশা। তবে ছয় মাস ক্ষমতায় থাকার পর পরিস্থিতি এখন মিশ্র। দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগে কিছু অগ্রগতি দেখালেও, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি পূরণে তিনি এখনো অনেকটা পিছিয়ে আছেন।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের অ্যাশিশ প্রধানের মতে, শাহ সাধারণত ক্যামেরা এড়িয়ে চলেন, যা সংকটের সময়ে মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি আরও বলেন, ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা এতটাই বেশি যে, উন্নয়নের চেয়ে এখন পুনর্গঠনই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। নেপালকে হয়তো জলবায়ু পরিবর্তনকে এখন থেকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার অপরিহার্য বিষয়’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তবে সরকারের তৎপরতা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্যও পাওয়া যাচ্ছে। কাঠমান্ডুর বাসিন্দা প্রকাশ আরিয়াল জানান, আগের সরকারের তুলনায় বর্তমান প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মাঠে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে, যা কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। নেপাল টাইমস-এর প্রকাশক কুন্দা দীক্ষিতের মতে, ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের সময়ের তুলনায় এবার সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি বেশি দৃশ্যমান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং যেসব সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে কাজ করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হলো এবং ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে সহায়তা কত দ্রুত পৌঁছাল, তার ওপরই সরকারের সক্ষমতার মূল্যায়ন নির্ভর করবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে নেপালের জন্য পরিস্থিতি বেশ জটিল। বন্যায় জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ রপ্তানি খাত হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া চীনের সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ ধ্বংস হওয়া এবং পর্যটন এলাকাগুলোর ক্ষতি দেশটির অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও, সেই অর্থ স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে, এই ভয়াবহ দুর্যোগ কেবল নেপালের অবকাঠামো নয়, বরং প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও তার সংস্কার কর্মসূচির সক্ষমতাকেও বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ মোকাবিলার মতো সম্পদ নেপালের সীমিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কালো স্যুট ও সানগ্লাসে তাকে প্রায়ই দেখা যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নিজের বক্তব্যের বড় অংশ তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি দুর্যোগকবলিত এলাকাও পরিদর্শন করেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নিজের বোন ও তার পরিবারের সদস্যদের খুঁজতে তিনি মর্গে মর্গে ঘুরছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শাহের সরকারও বলছে, সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল এএফপিকে বলেন, এত বড় দুর্যোগে কিছু এলাকায় আরো উন্নতি করার প্রয়োজন থাকবেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সুযোগের যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন, ভোটাররা এখনো তার বাস্তব ফলের অপেক্ষায় আছেন।
Leave a Reply