রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। গত ২১শে আগস্ট ভোরে রংপুর জিলা স্কুলের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২) নিজ বাসায় নির্মমভাবে প্রাণ হারান। ঘটনার পর ২২শে আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা দরজা ভেঙে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে। এর মধ্যে ছোট ছেলে প্রিয়মের মরদেহ শোয়ার ঘরের খাটের নিচ থেকে পাওয়া যায়।
তদন্তের শুরু থেকেই পুলিশের কর্মকাণ্ড ছিল বেশ বিতর্কিত। ২৩শে আগস্ট গভীর রাতে পুলিশ মাছুয়াপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে স্থানীয় যুবক মুগ্ধ দাস (২৩) ও তার মামাতো ভাই সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) আটক করে। পরদিন তৎকালীন পুলিশ কমিশনার ডিআইজি আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার ব্যাখ্যা দেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে দেয়া তথ্যের ধারাবাহিক পরিবর্তন তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। ঘটনার সময়, ভুক্তভোগীদের মরদেহের অবস্থান এবং অপরাধের পটভূমি নিয়ে অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে পুলিশ ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ উপস্থাপন করেছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, আসামিরা ২০শে আগস্ট রাতে পাশের ভবনের ছাদ টপকে গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করছিল এবং বাধা পেয়ে তারা এই ঘটনা ঘটায়। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই এমন দুই সাধারণ মাদকাসক্ত তরুণের পক্ষে কোনো জোরালো প্রতিরোধ ছাড়াই চারজনকে নিখুঁতভাবে হত্যা করা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য। এছাড়া আসামিদের মাদকাসক্তির মাত্রা পরীক্ষা বা ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণের আগেই পুলিশ দ্রুততার সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তের নানা পর্যায়ে পুলিশের ভূমিকা ছিল রহস্যময়। ফরেনসিক রিপোর্টে ধর্ষণের কোনো আলামত না পাওয়া গেলেও ডোমের একটি বক্তব্য ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের পর ছাদের আলামত ধুয়ে ফেলার অভিযোগও উঠেছে। গত ২৬শে আগস্ট রাতে পুলিশের পাহারায় থাকা অবস্থায় বাড়ির পানির মোটর চালিয়ে ছাদ ও সিঁড়ি ধুয়ে ফেলার ঘটনা ঘটে। পুলিশের দাবি, এটি ভুলবশত হয়েছে, তবে এই ঘটনা তদন্তের স্বচ্ছতাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
২৭শে আগস্ট বিদায়ী পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ তার আগের ভাষ্য পরিবর্তন করে বলেন, হত্যাকাণ্ডটি ভোররাতে নয়, বরং দিনের আলো ফোটার সময় ঘটেছে। তিনি জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ ও সামাজিক জাতিগত দূরত্বের বিষয়ও খতিয়ে দেখার কথা জানান। এর আগে পুলিশ প্রথম সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিল, গভীর রাতে এই ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের এই স্ববিরোধী অবস্থান এবং তড়িঘড়ি করে সংবাদ সম্মেলন ও কমিশনারের কান্নার মতো আবেগপ্রবণ কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে পুলিশের পেশাদারিত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এদিকে, ২৯শে আগস্ট সাংবাদিক সেলিম সরকারের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার জেরে সিদ্ধার্থ দাসের পরিবারের সদস্যদের ডিবি পুলিশ আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। এছাড়া মামলার তদন্তে বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও কেবল আসামিদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে তদন্ত শেষ করার প্রবণতা নিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট মহলেও উদ্বেগ রয়েছে। সব মিলিয়ে পুলিশের এই অসংলগ্ন পদক্ষেপগুলো চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটিকে ঘিরে জনমনে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একাধিক সরকারি সংস্থার তদন্তে ঘটনার পুরো বিষয় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঘটনার পর দ্রুতই অভিযুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই গ্রেপ্তার পর্যন্ত সব ঠিক থাকলেও পরে পুলিশের একের পর এক পদক্ষেপ প্রশ্ন তৈরি করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাড়িটি ছিল তালাবদ্ধ এবং ভেতর থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপর গণপতির স্বজনরা পুলিশে খবর দেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেখানে ঘটনার পর্যায়ক্রম ও ব্যাখ্যাসহ এর সঙ্গে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
Leave a Reply