রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ দাস আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার আব্দুল মাবুদ বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, মাদক সেবনের সময় গৃহকর্তা গণপতি চক্রবর্তী তাদের দেখে ফেলায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। আসামিরা ডাকাতির নাটক সাজাতে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২০ আগস্ট রাত ১২টার পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ তাদের বন্ধু সীমান্তের বাসায় গিয়ে ইয়াবা সেবন শুরু করে। রাত ৩টার দিকে আরও মাদকের প্রয়োজন হলে তারা ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তর কাছ থেকে সংগ্রহ করে গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে গিয়ে অবস্থান নেয়। ভোরের আলো ফোটার পর শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে এসে তাদের দেখে ফেলেন এবং ধমক দেন। এ সময় মানসম্মানের ভয়ে তারা আতঙ্কিত হয়ে শিক্ষককে ধরে ফেলেন এবং গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।
পুলিশ কমিশনার জানান, শিক্ষককে হত্যার পর তার স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে এলে আসামিরা তাদেরও একইভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। মেয়েকে মারার সময় তারা পাশের কবুতরের খাবার রাখার বক্স থেকে রশি এনে ব্যবহার করে। এরপর সিদ্ধার্থ সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো করতে বিদ্যুতের তার কেটে দেয়। পরে তারা দোতলায় গিয়ে ১২ বছর বয়সি আয়ুশ চক্রবর্তীকে পেটিকোট দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর তারা ক্লান্ত হয়ে বাথরুমে পানি ঢেলে এবং ডাকাতির সাজাতে আলমারি ও ড্রয়ার তছনছ করে ১৫ হাজার টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে।
ঘটনার পর মুগ্ধকে তিন কিলোমিটার দূরের এক শ্মশান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখানে সে কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের কাছে আশ্রয় ও পানি চেয়েছিল, কিন্তু বিদ্যুৎ তাকে আশ্রয় না দিয়ে পুলিশকে খবর দেয়। বিদ্যুৎ দাস আদালতে ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। এদিকে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। আরএমপি কমিশনার স্পষ্ট করেছেন যে, নিহতদের ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। গলায় ফাঁস লাগলে বা শ্বাসরোধে মৃত্যু হলে শারীরিক যে পরিবর্তন হয়, এটি তারই অংশ।
তদন্তের আলামত নষ্ট করার অভিযোগ প্রসঙ্গে আরএমপির ডিবি উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, গত বুধবার সিদ্ধান্তের ভাই পার্থ দাস যে অভিযোগ করেছিলেন তা ভিত্তিহীন। গুরুত্বপূর্ণ আলামত আগেই সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পানি দিয়ে আলামত ধুয়ে ফেলার কোনো ঘটনা ঘটেনি। নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ সেখানে মোতায়েন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে মামলা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমানে আসামিদের ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরে গণপতির লাশ টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তার স্ত্রী ও মেয়ের লাশ ছাদের সিঁড়ির গেটের আড়ালে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাত ৩টার দিকে আরো ইয়াবা খাওয়ার ইচ্ছা হলে ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তকে ফোন দিয়ে আরো চারটি ইয়াবা চায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শিক্ষক গণপতির ছাদের চারদিকে অর্ধেক দেয়াল থাকায় বাইরে থেকে দেখা যেত না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সে রাতে তারা দুজন আটটি ইয়াবা সেবন করেছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জবানবন্দির বরাত দিয়ে আরএমপি কমিশনার বলেন, তখন মানসম্মানের ভয়ে তাদের মাথা কাজ করছিল না।
Leave a Reply